চাঁদ-আকাশে চিনের বেশি খরচ, তবু ভারতের হাতেই ‘Trust Card’
মহাকাশ প্রতিযোগিতায় চিন ও ভারতের মধ্যে ব্যবধান এখনও স্পষ্ট। পরিকাঠামো, বাজেট এবং মহাকাশ কর্মসূচির পরিসরে চিন ভারতের তুলনায় অনেক বেশি বিনিয়োগ করে। কিন্তু কম খরচে সফল মহাকাশ অভিযান, নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ পরিষেবা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারত তৈরি করেছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা। ফলে শুধু কত টাকা খরচ হচ্ছে, তা নয়—কীভাবে সেই অর্থকে কার্যকর প্রযুক্তি ও আস্থায় পরিণত করা হচ্ছে, সেটিও হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
লিখেছেন
Priya Jana
মহাকাশে চিনের বিপুল বিনিয়োগ, ভারতের শক্তি অন্য জায়গায়
মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তির দৌড়ে চিন দ্রুত নিজের অবস্থান শক্ত করেছে। বিপুল সরকারি বিনিয়োগ, উন্নত উৎক্ষেপণ পরিকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ পরিকল্পনা এবং চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযানে ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে বেজিং এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান মহাকাশ শক্তি। অর্থের বিচারে ভারতের সঙ্গে চিনের ব্যবধানও যথেষ্ট বড়।
তবে মহাকাশ প্রতিযোগিতাকে শুধু বাজেটের অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। তুলনামূলকভাবে কম খরচে জটিল অভিযান সফল করা, নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ সহযোগিতায় বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ভারতের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
চিনের সুবিধা কোথায়?
চিনের মহাকাশ কর্মসূচির অন্যতম বড় শক্তি হল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের পরিমাণ এবং পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। বেজিং মহাকাশকে শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্র হিসেবে নয়, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও দেখে।
চন্দ্র গবেষণা, মহাকাশ স্টেশন, গভীর মহাকাশ অনুসন্ধান এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে চিনের দ্রুত অগ্রগতি তার এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই ফল। বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা মহাকাশ পরিকাঠামো তৈরির কাজকেও ত্বরান্বিত করেছে।
ভারতের শক্তি—সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ও নির্ভরযোগ্যতা
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সীমিত সম্পদের মধ্যে সর্বোচ্চ ফল পাওয়ার চেষ্টা। Indian Space Research Organisation বা ISRO বহু বছর ধরে তুলনামূলকভাবে কম খরচে জটিল মহাকাশ অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
চন্দ্রযান-৩-এর চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে সফল অবতরণ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে PSLV-এর ধারাবাহিক সাফল্য ভারতকে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বাজারেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দিয়েছে।
এই জায়গাতেই ভারতের ‘Trust Card’ বা আস্থার শক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি দেশ মহাকাশে কত টাকা বিনিয়োগ করছে, তার পাশাপাশি সেই বিনিয়োগ থেকে কতটা নির্ভরযোগ্য পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে—আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু বাজেট নয়, ‘Cost per Mission’-ও গুরুত্বপূর্ণ
মহাকাশ গবেষণায় বিপুল অর্থ ব্যয় করলেই সাফল্য নিশ্চিত হয় না। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির পুনর্ব্যবহার, উৎক্ষেপণের নির্ভরযোগ্যতা এবং স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তি তৈরি করার সক্ষমতাও বড় ভূমিকা নেয়।
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে এই মডেল অনুসরণ করেছে। তুলনামূলকভাবে কম বাজেটে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া, যোগাযোগ, নেভিগেশন এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণ ভারতের সক্ষমতাকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় ভারতের বাড়তি সুবিধা
মহাকাশ কূটনীতিতেও ভারতের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশ ভারতের উৎক্ষেপণ পরিষেবা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণার সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির একটি বড় অংশ বেসামরিক ও উন্নয়নমূলক ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় বহু দেশের কাছে নয়াদিল্লি একটি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে।
এই ‘trust’ বা আস্থাই ভারতের অন্যতম বড় সম্পদ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলির সঙ্গে স্যাটেলাইট, যোগাযোগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পৃথিবী পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তিতে সহযোগিতা ভারতের মহাকাশ কূটনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
চিনকে কি ভারত মহাকাশে টেক্কা দিতে পারবে?
নিকট ভবিষ্যতে বাজেট বা মহাকাশ পরিকাঠামোর পরিসরে চিনকে ছাড়িয়ে যাওয়া ভারতের জন্য সহজ নয়। চিন ইতিমধ্যেই মহাকাশ স্টেশন, ভারী উৎক্ষেপণ ক্ষমতা এবং গভীর মহাকাশ অভিযানে বড় পরিসরের কর্মসূচি চালাচ্ছে।
তবে ভারতের লক্ষ্য সরাসরি চিনের সঙ্গে অর্থের প্রতিযোগিতা করা নয়। বরং কম খরচে উন্নত প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য উৎক্ষেপণ, বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজস্ব জায়গা আরও শক্তিশালী করাই নয়াদিল্লির কৌশল।
ভারতের মহাকাশ খাতেও এখন বেসরকারি সংস্থার প্রবেশ বাড়ছে। এর ফলে আগামী দিনে উৎক্ষেপণ পরিষেবা, স্যাটেলাইট নির্মাণ এবং মহাকাশভিত্তিক বাণিজ্যে ভারতের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।
শেষ কথা
মহাকাশের নতুন প্রতিযোগিতায় চিনের হাতে রয়েছে বিপুল অর্থ ও পরিকাঠামো। ভারতের হাতে রয়েছে তুলনামূলক কম খরচে প্রযুক্তিগত সাফল্যের অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থা। ফলে এই প্রতিযোগিতা কেবল ‘কে বেশি খরচ করছে’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়।
চিন যেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ দিয়ে মহাকাশ শক্তির পরিধি বাড়াচ্ছে, ভারত সেখানে দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিজের প্রভাব তৈরি করছে। আগামী দশকে মহাকাশ অর্থনীতি যত বড় হবে, এই ‘trust card’-ই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
Keep reading
More in আন্তর্জাতিক
আন্তর্জাতিক
Gypsy Rose Blanchard-এর ভাই Dylan কে? Ken Urker-এর পর কেন আলোচনায় পরিবার
Gypsy Rose Blanchard-এর সৎভাই Dylan Blanchard সাধারণত প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু Gypsy-র প্রাক্তন বাগদত্তা ও তাঁর মেয়ের বাবা Ken U…
আন্তর্জাতিক
ফ্লাইদুবাইয়ের ‘ক্র্যাশ-চেষ্টা’র পর মনে পড়ছে আরও ৪ ভয়াবহ ককপিট ঘটনা
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানে সহ-পাইলটের বিরুদ্ধে ক্যাপ্টেনকে ছুরি দিয়ে হামলা এবং বিমানটি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করার অভিযোগের পর ফের আলোচনায় ককপি…
আন্তর্জাতিক
ফ্লাইদুবাইয়ের ‘ক্র্যাশ-চেষ্টা’য় ভারতীয় পাইলট স্মিত মাচ্ছরকে কি কুঠার দিয়ে মারা হয়েছিল? কী বললেন নেটানিয়াহু
ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 বিমানের ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরকে কীভাবে হামলা করা হয়েছিল, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী…
আন্তর্জাতিক
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুলা বনাম ফ্লাভিও, সর্বশেষ জনমত সমীক্ষায় কী বলছে?
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটের আগে নতুন একাধিক জনমত সমীক্ষায় প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ফ্লাভিও বলসোনারো-র মধ…
আন্তর্জাতিক
অক্টোবরের US Visa Bulletin প্রকাশ, ভারতীয় Green Card আবেদনকারীদের জন্য কী বদলাল?
October 2026 Visa Bulletin প্রকাশের সঙ্গে নতুন মার্কিন অর্থবর্ষ শুরু হয়েছে। ভারতীয় employment-based Green Card আবেদনকারীদের জন্য EB-1-এ কিছু…
আন্তর্জাতিক
‘ইন্টারনেটের থেকেও বড়’, AI-এর নাম বদলে ‘Superintelligence’ করার প্রস্তাবে ফের জোর ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘Artificial Intelligence’ না বলে ‘Superintelligence’ নামে অভিহিত করার প্রস্তাব…
