শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফরের আগে বাড়ছে চীনা বিনিয়োগ, FDI-তে নতুন মোড়
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফরকে ঘিরে যখন কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে, তখন ভারতেও দেখা যাচ্ছে চীন-সংযুক্ত বিনিয়োগের নতুন গতি। ২০২৬ সালের মে মাসে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বা FDI সংক্রান্ত নিয়মে পরিবর্তনের পর ২৯টি প্রকল্পে প্রায় ৪,৮৯৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব সামনে এসেছে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উৎপাদন, ওষুধ, ডেটা সেন্টার এবং পরিবহণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রশ্ন উঠছে, দীর্ঘ সীমান্ত উত্তেজনার পর ভারত ও চীন কি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে?
লিখেছেন
Priya Jana
শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরের আগে চীনা পুঁজির নতুন স্রোত
নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে কি? এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফরের খবর এবং ভারতীয় অর্থনীতিতে চীন-সংযুক্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে।
শি জিনপিংয়ের আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সফরটি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। তবে তা বাস্তবায়িত হলে ২০১৯ সালের পর এটি হবে তাঁর প্রথম ভারত সফর এবং ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটেই ভারতের বাজারে চীন-সংযুক্ত পুঁজির প্রবাহ নতুন করে নজর কেড়েছে।
FDI নিয়মে পরিবর্তনের পর প্রায় ৪,৯০০ কোটি টাকার প্রস্তাব
ভারত সরকার ২০২৬ সালের মে মাসে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের নিয়মে পরিবর্তন আনে। নতুন ব্যবস্থায়, সীমান্তবর্তী দেশের কোনও সংস্থার চীনা মালিকানা বা অংশীদারিত্ব ১০ শতাংশ পর্যন্ত এবং তা নিয়ন্ত্রণমূলক না হলে নির্দিষ্ট শর্তে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের পর ২০ আগস্ট পর্যন্ত ২৯টি প্রকল্পে প্রায় ৪,৮৯৬ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে বলে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে—
তথ্যপ্রযুক্তি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI
তথ্য ও যোগাযোগ পরিষেবা
উৎপাদন শিল্প
ওষুধ শিল্প
ডেটা সেন্টার
পরিবহণ পরিষেবা
এই তালিকা থেকেই স্পষ্ট, বিষয়টি শুধু ছোটখাটো আর্থিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে বিদেশি পুঁজি প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গালওয়ানের পর যে দরজা বন্ধ হয়েছিল, তা কি আবার খুলছে?
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। সেই সময় সীমান্ত ভাগ করে নেওয়া দেশগুলির বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ভারত কঠোর সরকারি অনুমোদনের নিয়ম চালু করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় সংস্থাগুলিতে সুযোগসন্ধানী অধিগ্রহণ ঠেকানো এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ মোকাবিলা করা।
ফলে চীন থেকে সরাসরি বিনিয়োগে কার্যত বড় ধাক্কা লাগে।
২০২৫-২৬ অর্থবর্ষেও ভারতের সরকারি অনুমোদনের তালিকায় চীনের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। সরাসরি চীনা বিনিয়োগের মাত্র একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল। অর্থাৎ, সাম্প্রতিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সরাসরি চীনা FDI-র বিস্ফোরণ বলা ঠিক হবে না।
বরং নতুন নিয়মে এমন বিদেশি সংস্থা বা তহবিলের জন্য পথ সহজ হয়েছে, যাদের মালিকানা কাঠামোয় সীমিত চীনা অংশীদারিত্ব রয়েছে। ফলে ভারত-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনটি এখনই পুরোপুরি সরাসরি বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত এবং সতর্ক নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
অর্থনীতি ও কূটনীতি কি একই পথে এগোচ্ছে?
শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগও বেড়েছে। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা চলেছে।
একদিকে সীমান্ত প্রশ্ন এখনও পুরোপুরি মেটেনি। অন্যদিকে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বাস্তবতা ভারতকে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে বাধ্য করছে।
ভারতের শিল্পক্ষেত্র এখনও বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক উপকরণ এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য চীনা সরবরাহের উপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সহজ নয়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই দিল্লির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল—কীভাবে প্রয়োজনীয় বিদেশি পুঁজি ও শিল্প বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হবে, আবার একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থও সুরক্ষিত রাখা হবে।
ভারত-চীন সম্পর্কে কি নতুন অধ্যায়ের সূচনা?
শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ভারত সফর এবং চীন-সংযুক্ত বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে একসঙ্গে দেখলে ভারত-চীন সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এই পরিবর্তনকে সম্পূর্ণ সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখা এখনই তাড়াহুড়ো হবে।
সীমান্ত বিরোধ, কৌশলগত প্রতিযোগিতা এবং বিশাল বাণিজ্য ঘাটতির মতো সমস্যাগুলি এখনও বহাল রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ১১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অসমতা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগকে স্পষ্ট করে।
তাই ভারতের বর্তমান কৌশল সম্ভবত সম্পূর্ণ বন্ধুত্ব বা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার নয়। বরং এটি একটি হিসাবি নীতি—যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থনৈতিক সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে সতর্কতা বজায় থাকবে।
সামনে কী?
আগামী ব্রিকস সম্মেলনে শি জিনপিং ভারতে এলে তা নিঃসন্দেহে ভারত-চীন সম্পর্কের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করবে। একই সময়ে চীন-সংযুক্ত পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সম্পর্ক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে—এই বিনিয়োগ বৃদ্ধি কি সাময়িক নীতিগত পরিবর্তনের ফল, নাকি ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্মিলনের শুরু?
এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে সীমান্ত আলোচনার অগ্রগতি, শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফরের ফলাফল এবং ভারত সরকার ভবিষ্যতে চীন-সংযুক্ত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা উদার বা সতর্ক নীতি গ্রহণ করে তার উপর।
Keep reading
More in ব্যবসা-বাণিজ্যের

ব্যবসা-বাণিজ্যের
পিএম কিষান যোজনার ২৪তম কিস্তি কবে? কৃষকদের অ্যাকাউন্টে ২,০০০ টাকা পাঠানোর সম্ভাব্য তারিখ
প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি যোজনার ২৪তম কিস্তি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৩০ অক্টোবর ২০২৬-এ কিস্তি দেওয়…

ব্যবসা-বাণিজ্যের
সবুজ বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়তেই চাপে উত্তর ভারতের পাওয়ার গ্রিড, নিরাপদ সীমা ছাড়াচ্ছে ট্রান্সফরমারের লোড
রাজস্থানে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাড়ায় উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যু…

ব্যবসা-বাণিজ্যের
উৎপাদন খরচের চাপে ফের দাম বাড়াবে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার, জানালেন সিইও প্রিয়া নায়ার
কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা চালিয়ে যাবে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড (HUL)। সংস্…

ব্যবসা-বাণিজ্যের
৫০ বছরের অভিজ্ঞ কর্মী থেকে ২৩ বছরের ইঞ্জিনিয়ার—মাইক্রোসফটের স্বেচ্ছাবসর প্রস্তাবে দ্বিধায় কর্মীরা
মাইক্রোসফট বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০,০০০ কর্মীকে আর্থিক সহায়তাসহ স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব বিবেচনা করার সুযোগ দিয়েছে। ভারতে সংস্থাটির কর…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে নোয়েল টাটার আপত্তি, চন্দ্রশেখরনের পুনর্নিয়োগ ঘিরে বিতর্ক
টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনের আরও পাঁচ বছরের মেয়াদে পুনর্নিয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল ট…
ব্যবসা-বাণিজ্যের
রিলায়েন্স জিওর IPO ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, কী সম্ভাবনা টেলিকম ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে?
রিলায়েন্স জিওর সম্ভাব্য IPO ঘিরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ভারতের টেলিকম ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ক্ষেত্রে জিওর বিস্তার, গ্রাহকভি…
