নিউজ

সাফল্যের আড়ালে: ভারতের জঙ্গলে চিতাদের দীর্ঘমেয়াদি বাসস্থান কি সত্যিই প্রস্তুত?

আফ্রিকা থেকে চিতা এনে ভারতের জঙ্গলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ ‘প্রজেক্ট চিতা’ জন্ম দিয়েছে নতুন আশার। চিতাদের বংশবৃদ্ধি এবং ভারতীয় পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার কিছু ইতিবাচক লক্ষণ মিললেও, তাদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার উপযুক্ত পরিবেশ কতটা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের সাফল্য শুধু চিতার সংখ্যা বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; প্রাকৃতিক পরিবেশে তাদের টিকে থাকা এবং স্বনির্ভর জনসংখ্যা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Share
সাফল্যের আড়ালে: ভারতের জঙ্গলে চিতাদের দীর্ঘমেয়াদি বাসস্থান কি সত্যিই প্রস্তুত?

ভারতের জঙ্গলে চিতাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে নামিবিয়া থেকে আটটি চিতা এনে মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে ছাড়া হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আসে আরও ১২টি চিতা। পরবর্তী সময়ে বতসোয়ানা থেকেও চিতা আনা হয়। কয়েক দশক আগে ভারত থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এই প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই শুরু হয় ‘প্রজেক্ট চিতা’।

কিন্তু এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য কেবল আফ্রিকার চিতাদের ভারতে নিয়ে আসা নয়। তাদের জন্য এমন একটি বাস্তুতন্ত্র তৈরি করাও জরুরি, যেখানে পর্যাপ্ত শিকার, উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র থাকবে। চিতারা যাতে মানুষের ক্রমাগত হস্তক্ষেপ ছাড়াই বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে, সেটাই প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি।

বংশবৃদ্ধিতে সাফল্য, তবু প্রশ্নের অবকাশ

ভারতের পরিবেশে চিতাদের বংশবৃদ্ধি প্রকল্পটির অন্যতম ইতিবাচক দিক। ২০২৬ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারতে চিতার সংখ্যা বেড়ে ৫৩-তে পৌঁছেছিল। এর মধ্যে ৩৩টি চিতার জন্ম হয়েছে ভারতেই। সরকারি মূল্যায়নে চিতাদের মানিয়ে নেওয়া, শিকার ধরার সক্ষমতা এবং পর্যবেক্ষণের ফলাফলকে আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে জন্মহার বা মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই যে একটি বন্যপ্রাণী প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদে সফল হয়েছে, তা বলা যায় না। ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর প্রকাশিত আফ্রিকা জিওগ্রাফিক-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের চিতা প্রকল্পে বংশবৃদ্ধির সাফল্য থাকলেও বহু চিতা এখনও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে রয়েছে। প্রতিবেদনে প্রায় ৫৯টি চিতার উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের স্বাধীনভাবে বন্য পরিবেশে টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারি মে মাসের হিসাব ও অক্টোবরের ওই প্রতিবেদনের তথ্য ভিন্ন সময়ের; তাই দুটিকে একই সময়ের জনসংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখা উচিত নয়।

কুনোর পরিবেশ কি যথেষ্ট উপযুক্ত?

মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যান এই প্রকল্পের প্রধান কেন্দ্র। এখানকার খোলা বনভূমি, তৃণভূমি এবং হরিণসহ বিভিন্ন তৃণভোজী প্রাণীর উপস্থিতি চিতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে চিতার দীর্ঘমেয়াদি বসবাসের জন্য শুধু খাবার থাকলেই চলে না। পর্যাপ্ত বিচরণক্ষেত্র, নিরাপদ প্রজননস্থল, অন্য শিকারি প্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থান এবং সংরক্ষিত এলাকার বাইরে চলে গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

চিতারা সাধারণত বিস্তীর্ণ এলাকায় বিচরণ করে। ফলে একটি নির্দিষ্ট জাতীয় উদ্যানের মধ্যে তাদের দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা ধরে রাখা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। কুনোতে চিতার পাশাপাশি চিতাবাঘেরও উপস্থিতি রয়েছে। খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয়ের মতো বিষয়গুলি তাই এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

শুধু চিতা আনা নয়, বাসস্থান তৈরি করাও জরুরি

চিতাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের জন্য কুনোর পাশাপাশি অন্য উপযুক্ত অঞ্চল তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সরকারি পরিকল্পনায় মধ্যপ্রদেশের গান্ধীসাগর অভয়ারণ্যকে অতিরিক্ত বাসস্থান হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। গুজরাতের বন্নি তৃণভূমি এবং মধ্যপ্রদেশের নৌরাদেহীর মতো এলাকাতেও প্রকল্প সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে।

এই ধরনের সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি এলাকার পরিবেশগত উপযোগিতা আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি। পর্যাপ্ত শিকার, প্রাকৃতিক উদ্ভিদ, জল এবং নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র নিশ্চিত না করে শুধু নতুন এলাকায় চিতা ছেড়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে বিভিন্ন সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ ও চলাচলের সুযোগ তৈরি করা গেলে চিতার জনসংখ্যার দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব বাড়তে পারে।

মৃত্যুর ঘটনা ও ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

বন্যপ্রাণীকে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে স্থানান্তর করার ক্ষেত্রে নানা ধরনের ঝুঁকি থাকে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, রোগের আশঙ্কা, প্রজনন, শাবকের বেঁচে থাকা এবং পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামের সঠিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর উপরই নজর রাখতে হয়।

চিতার মৃত্যু ঘটলেই প্রকল্প ব্যর্থ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। বন্য পরিবেশে শাবকের মৃত্যুহার স্বাভাবিকভাবেও বেশি হতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক চিতার মৃত্যু, বন্দি অবস্থায় আঘাত কিংবা ব্যবস্থাপনাজনিত সমস্যার ঘটনা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আফ্রিকা জিওগ্রাফিক-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলিকে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

সাফল্য মাপার আসল মাপকাঠি কী?

চিতার সংখ্যা বৃদ্ধি, ভারতীয় পরিবেশে তাদের বংশবৃদ্ধি এবং নতুন অঞ্চলে পুনর্বাসনের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য বিচার করতে হলে আরও কয়েকটি বিষয় দেখতে হবে—কতগুলি চিতা স্বাধীনভাবে খোলা পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারছে, তাদের প্রজনন কতটা স্থিতিশীল, শাবকেরা কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠছে এবং মানুষের নিয়মিত হস্তক্ষেপ ছাড়া জনসংখ্যা টিকে থাকতে পারছে কি না।

ভারতের চিতা প্রকল্পের সামনে তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সাফল্যের আড়ালে থাকা প্রশ্নগুলির উত্তর মিলবে ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত বাসস্থান তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতগুলি চিতা ভারতে এসেছে বা কতগুলি শাবকের জন্ম হয়েছে তার উপর নয়, বরং ভারতের প্রকৃতিতে তারা কতটা স্বাভাবিক ও স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারছে, তার উপরও।

Enjoyed this story? Share it.

Share

Keep reading

More in নিউজ

সব দেখুন
কালীপুজোর আগে সবুজ বাজির পরীক্ষা ৩০ অক্টোবর, নিরাপত্তায় জোর
New

নিউজ

কালীপুজোর আগে সবুজ বাজির পরীক্ষা ৩০ অক্টোবর, নিরাপত্তায় জোর

কালীপুজোর আগে সবুজ বাজির গুণমান যাচাই এবং বাজির বাজারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ৩০ অক্টোবর সবুজ বাজির নমুনা পরীক্ষা…

2 min read
শ্রীযোগেন চৌধুরী (১৯৩৯–২০২৬): অসুস্থতার আড়ালেও সৃষ্টির সাধনা
Breaking

নিউজ

শ্রীযোগেন চৌধুরী (১৯৩৯–২০২৬): অসুস্থতার আড়ালেও সৃষ্টির সাধনা

প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরীর জীবন ও শিল্প যেন সৃষ্টির প্রতি অবিচল নিষ্ঠার এক অনন্য উদাহরণ। জীবনের শেষ পর্বে গুরুতর অসুস্থতার সঙ…

4 min read
সীমান্ত উদ্বেগ: চিনের সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাস, আশ্বাসেই কি কাটবে আশঙ্কা?
Breaking

নিউজ

সীমান্ত উদ্বেগ: চিনের সঙ্গে সংঘাতের ইতিহাস, আশ্বাসেই কি কাটবে আশঙ্কা?

ভারত ও চিনের সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘদিনের। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি-র অবস্থান নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য, টহলদারি নিয়ে সংঘাত এবং সা…

3 min read
শত্রুরূপে চিহ্নিত বই: রাজনৈতিক সংঘাতের নিশানায় সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
Breaking

নিউজ

শত্রুরূপে চিহ্নিত বই: রাজনৈতিক সংঘাতের নিশানায় সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্লাব, পুজো কমিটি ও পার্টি অফিসের দখল নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে এ বার দুর্গাপুজোর সময় বিরোধী মতাদর্শের ব…

3 min read
বর্ধমান মেডিক্যালের ফেস্টে ৫৫০০ টাকা চাঁদা দাবি! চিকিৎসক সংগঠনের নাম করে চাপ দেওয়ার অভিযোগে বিতর্ক
Breaking

নিউজ

বর্ধমান মেডিক্যালের ফেস্টে ৫৫০০ টাকা চাঁদা দাবি! চিকিৎসক সংগঠনের নাম করে চাপ দেওয়ার অভিযোগে বিতর্ক

বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের ফেস্টকে কেন্দ্র করে ৫৫০০ টাকা চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। একটি চিকিৎসক সংগঠনের নাম করে চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযো…

2 min read
অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে ‘প্রোটোকল’ কী হবে? চোরবাগান প্রসঙ্গে প্রশ্ন জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনের
Breaking

নিউজ

অন্য রোগীরাও কর্পোরেট হাসপাতালে যেতে চাইলে ‘প্রোটোকল’ কী হবে? চোরবাগান প্রসঙ্গে প্রশ্ন জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনের

চোরবাগান সংক্রান্ত ঘটনায় কর্পোরেট হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টি ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠন। অন্য রোগীরাও যদি একই ভাবে কর্প…

2 min read